ডলারের দুর্বলতায় মুদ্রাবাজারে নিম্নমুখী এশীয় মুদ্রাগুলোর বিনিময় হার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রতিক্রিয়ায় গত বছর ডলারের অবমূল্যায়ন ঘটে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতির প্রতিক্রিয়ায় গত বছর ডলারের অবমূল্যায়ন ঘটে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, ডলারের বিপরীতে এশিয়ার রফতানিনির্ভর দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার দ্রুত বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। গত সপ্তাহেও জাপানের ইয়েন ও দক্ষিণ কোরিয়ার ওন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে লেনদেন হয়েছে।

এশিয়ার দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার এখন এতটাই কমেছে যে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এ নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।

মুদ্রাবাজারে পাউন্ড ও ইউরোর মতো জি৭ দেশগুলোয় মুদ্রা এখন ডলারের চেয়ে ভালো পারফরম্যান্স করছে। কিন্তু এর বিপরীতে এশিয় মুদ্রাগুলোর দুর্বলতা বাজার বিশ্লেষকদের ভাবিয়ে তুলছে। তারা বলছেন, পূর্ব এশীয় দেশগুলোর বড় অংকের বাণিজ্য উদ্ধৃত্ত রয়ে গেছে। আবার দেশগুলোয় সুদহারও যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় কম। এ অবস্থায় মুদ্রাবাজারে ডলারের তুলনায় এসব দেশের মুদ্রার বিনিময় হারে ক্রমাগত পতনের বিষয়টি খুব একটা স্বাভাবিক নয়। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এআই খাতে বিপুল মূলধন চলে যাওয়া, জাপানের আর্থিক অনিয়মের আশঙ্কা এবং ট্রাম্পের সঙ্গে করা বিনিয়োগ চুক্তির প্রভাব পড়েছে মুদ্রার মূল্যায়নে।

ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংক বার্কলেসের এশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলের প্রধান মিতুল কোটেচা বলেন, ‘গত বছরের শেষার্ধে মার্কিন অর্থনীতির শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির কারণে ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল ছিল। ওই সময় এশিয়ার বিনিয়োগকারীরা বড় অংকের মার্কিন সম্পদ কেনায় দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হারে চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অধিক ব্যবহারে বিনিয়োগকারীরা এশিয়ার বাজার ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের দিকে ঝুঁকছেন। এতে বিপুল পরিমাণ মূলধন এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাচ্ছে।’

বিশ্লেষকরা আরো বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে বড় অংকের বিনিয়োগ চুক্তি এশীয় মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ তৈরি করেছে। চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে জাপান ৫৫ হাজার কোটি, দক্ষিণ কোরিয়া ৩৫ হাজার কোটি ও তাইওয়ান ২৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বড় আকারের মূলধন দেশের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার আরো কমে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান টি রো প্রাইসের পোর্টফোলিও ম্যানেজার ভিনসেন্ট চুং বলেন, ‘দেশগুলো কীভাবে বিশাল আকারের বিনিয়োগ জোগাড় করবে, তা নিয়ে বাজারে দুশ্চিন্তা রয়েছে। মূলত মূলধন বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় ডলারের বিপরীতে এসব দেশের স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হার কমে যাচ্ছে।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার জেসন প্যাং বলেন, ‘দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের চিপ নির্মাতারা এখন আয়কৃত ডলার দেশে ফিরিয়ে নিচ্ছেন না। বরং নতুন কারখানা তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে সে অর্থ রেখে দিচ্ছেন। ফলে স্থানীয় বাজারে ডলারের সরবরাহ কমে যাচ্ছে।’

এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীরা মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় আকারে বিনিয়োগ করছেন। একইভাবে তাইওয়ানের বীমা কোম্পানিগুলোও যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ করছে। এসব কারণে এশিয়ার দেশগুলোর মুদ্রার বিনিময় হার আরো দুর্বল হয়ে পড়ছে।

নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির অধীনে জাপান বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে দেশটির মুদ্রা ইয়েন আরো দুর্বল হয়েছে। এ পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলের অন্য মুদ্রাগুলোয়ও প্রভাব ফেলছে বলে মন্তব্য করেন এএনজেডের প্রধান অর্থনীতিবিদ রিচার্ড ইয়েটসেনগা।

ফ্রান্সভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংক সোসাইটি জেনারেলের কিট জুকস জানান, এশিয়ার দেশগুলোয় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং সঞ্চয় বেশি হচ্ছে। এসব দেশ তাদের প্রবৃদ্ধির জন্য রফতানির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। রফতানি ধরে রাখতে মুদ্রার বিনিময় হার কম রাখা এখন কাঠামোগত প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।

মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান যৌথভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে বলে বাজারে জোর আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ কোরিয়াও মুদ্রার বিনিময় হার ধরে রাখতে বৈদেশিক মুদ্রা বন্ড ছাড়ার সক্ষমতা বাড়িয়েছে। সব মিলিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি রফতানিনির্ভর হওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার বিনিময় হারকে চাপের মুখে রেখেছে।

অবশ্য ট্রেডারদের একটি অংশ এখনো মনে করছেন, ২০২৬ সালে এশিয়া অঞ্চলের মুদ্রাগুলোর পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে ভালো হতে পারে। জেপি মরগানের জেসন প্যাং বলেন, ‘চলতি বছর এশীয় মুদ্রা শক্তিশালী হবে এবং আমরা এখনো ইতিবাচক অবস্থানে আছি।’

বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সর্বশেষ ছয় মাসে মার্কিন ডলারের বিপরীতে এ অঞ্চলের মাত্র একটি প্রধান মুদ্রা শক্তিশালী হতে পেরেছে। সেটি হলো চীনের রেনমিনবি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে পাল্টাপাল্টি অবস্থান ও ভূরাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বৈশ্বিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি চীনের স্থানীয় মুদ্রার মূল্যায়নে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে। —এফটি অবলম্বনে

আরও